Friday, August 2, 2019

// // Leave a Comment

প্রিয় নবীজী (সা.) দেখতে কেমন ছিলেন

মহানবী (সা:) দেখতে কেমন ছিলেন?

জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত তিনি বলেন,রাসূলুল্লাহ (সা:) বলেছেন, আমার কাছে নবীগণকে পেশ করা হয়। মূসা (আঃ) এর মধ্যে বিভিন্ন লোকের সাদৃশ্য বিদ্ধমান ছিল। তিনি যেন শানুয়াহ গোত্রের লোক। আমি ঈসা ইবনে মারইয়াম (আঃ) কে উরওয়া ইবনে মাসঊদের সাদৃশ্যপূর্ণ দেখতে পাই। তারপর আমি ইবরাহীম (আঃ) কে দেখতে পাই এবং তাকে পাই ’তোমাদের সঙ্গীর’ সাথে সর্বাধিক সাদৃশ্যপূর্ণ। তোমাদের সঙ্গী বলে তিনি নিজেকে বুঝিয়েছেন। আর আমি জিবরীল (আঃ) কে দিহইয়া (কালবী) এর সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ দেখতে পাই। (সহীহ মুসলিম, হা/৪৪১; মুসনাদে আহমদ, হা/১৪৬২৯ সহীহ ইবনে হিব্বান, হা/৬২৩২ জামেউস সগীর, হা/৭৪৫১; মিশকাত, হা/৫৭১৪।)

জাবির ইবনি সামুরা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি একবার পূর্ণিমা রাতের স্নিগ্ধ আলোতে রাসূলুল্লাহ (সা:)-কে লাল চাদর ও লুঙ্গি পরিহিত অবস্থায় দেখলাম। তখন আমি একবার তার দিকে ও একবার চাঁদের দিকে তাকাতে থাকলাম। মনে হলো তিনি আমার কাছে পূর্ণিমার চাঁদের থেকে অধিকতর চমৎকার। (মুস্তাদরাকে হাকিম, হাদিস, ৭৩৮৩; মারেফাতুস সাহাবা, হাদিস, ১৪৩৫; মিশকাত, হাদিস, ৫৭৯৪)

হজরত আনাস ইবনি মালিক রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ((সা:)-এর গাত্রবর্ণ ছিল গৌর, মুখমণ্ডল ছিল অত্যন্ত সুশ্রী ও মাধূর্যমন্ডিত এবং দেহ মুবারক ছিল মাঝারি গড়নের। তার চুল একেবারে কোঁকড়ানো ছিল না, আবার একদম সোজাও ছিল না। ৪০ বছর বয়সে আল্লাহ তায়ালা তাকে নবুওয়াত দান করেন। এরপর মক্কায় ১০ বছর এবং মদিনায় ১০ বছর কাটান। আল্লাহ তায়ালা ৬০ বছর বয়সে তাকে ওফাত দান করেন। ওফাতকালে তার মাথা ও দাড়ির ২০টি চুলও সাদা ছিল না।(সহিহ বোখারী, ৫৯০০; সহিহ মুসলিম, ৬২৩৫; মুয়াত্তা মালেক, ১৬৩৯, ইবনি মাজাহ)

তিনি মাঝারি গড়নের হলেও যখন সবার সঙ্গে হাঁটতেন তখন তাঁকে সবার মধ্যে সবচেয়ে বেশি লম্বা দেখাত। এটি ছিল মূলত তাঁর মুজিজা। (ফাতহুল বারি : ৬/৫৭১)

আলী ইবনে আবু তালিব (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (সা:) বেশি দীর্ঘ কিংবা বেশি খাটো ছিলেন না। তাঁর হস্তদ্বয় ও পদদ্বয়ের তালু এবং আঙ্গুলসমূহ ছিল মাংসল। তাঁর মাথা ছিল কিছুটা বড় এবং হাত-পায়ের জোড়াগুলো ছিল মোটা। বুক হতে নাভি পর্যন্ত পশমের একটি সরু রেখা প্রলম্বিত ছিল। যখন পথ চলতেন মনে হতো যেন কোন উঁচু স্থান হতে নিচে অবতরণ করছেন। বর্ণনাকারী বলেন, তাঁর পূর্বে কিংবা পরে আমি তাঁর মতো (অনুপম আকর্ষণীয়) আর কাউকে দেখিনি। (মুসনাদে আহমাদ, হা/৭৪৬; মুস্তাদরাকে হাকেম, হা/৪১৯৪; সহীহ ইবনে হিব্বান, হা/৬৩১১।)

বারা’ (রাঃ) বর্ণনা করেছেন, ‘নাবী কারীম (সা:)-এর দৈহিক গঠন ছিল মধ্যম ধরণের। উভয় কাঁধের মধ্যে ছিল দূরত্ব এবং কেশরাশি ছিল দু’ কানের লতি পর্যন্ত বিস্তৃত। আমি নাবী কারীম (সা:)-কে সৌন্দর্যমন্ডিত পোশাকাদি পরিহিত অবস্থায় প্রত্যক্ষ করেছি। নাবী কারীম (সা:)-এর চাইতে অধিক সুন্দর কোন কিছু আমি কখনো প্রত্যক্ষ করি নি। (সহীহুল বুখারী ১ম খন্ড ৫০২ পৃঃ।)

আব্দুল্লাহ ইবনে সালাম (রা.) বলেন, ‘রাসুল (স.) যখন মদিনায় এসে পৌঁছলেন, লোকজন তাঁকে দেখার জন্য দ্রুত তাঁর দিকে ছুটতে লাগল এবং বলাবলি করতে লাগলো- রাসুলুল্লাহ (স.) এসেছেন। অতএব আমিও তাঁকে দেখার জন্য লোকদের সাথে উপস্থিত হলাম। আমি রাসুলুল্লাহ (স.)-এর চেহারা মুবারকের দিকে তাকিয়েই বুঝতে পারলাম যে, এই চেহারা কোনো মিথ্যুকের চেহারা নয়। তখন তিনি সর্বপ্রথম যে কথা বললেন, তা হলো- হে লোকসকল! তোমরা সালামের প্রসার ঘটাও, খাদ্য দান করো এবং মানুষ ঘুমিয়ে থাকা অবস্থায় (তাহাজ্জুদ) নামাজ আদায় করো। তাহলে নিশ্চয়ই তোমরা অনায়াসে জান্নাতে প্রবেশ করবে।’ (সুনানে তিরমিজি: ২৪৮৫)

প্রথমাবস্থায় রাসূলুল্লাহ (সা:) আহলে কিতাবের সঙ্গে সাদৃশ্য বজায় রেখে চলা পছন্দ করতেন এবং এ কারণে চুলে চিরুনী ব্যবহার করতেন, কিন্তু তাঁর সিঁথি প্রকাশ পেত না। কিন্তু পরবর্তী সময়ে সিঁথি প্রকাশিত। (সহীহুল বুখারী ১ম খন্ড ৫০৩ পৃঃ।)

তাঁকে জিজ্ঞেস করা হল যে, নাবী কারীম (সা:)-এর মুখমণ্ডল কি তলোয়ারের মতো ছিল? উত্তরে বলা হল, ‘না, বরং পূর্ণ চন্দ্রের মতো ছিল।’ এক বর্ণনায় আছে যে, ‘নাবী কারীম (সা:)-এর মুখমণ্ডল ছিল গোলাকার। (সহীহুল মুসলিম দারেমী, মিশকাত শরীফ ২য় খন্ড ৫১৭ পৃঃ।)

রুবাইয়্যা বিনতে মুআওয়িজ (রা.)- বলেছেন, ‘যদি তোমরা নাবী কারীম (সা:)-কে দেখতে তাহলে মনে হতো যে, তোমরা উদিত সূর্য দেখছ। (তিরমিযী শামায়েলের মধ্যে পৃ: ২ দারমী মিশকাত ২য় খন্ড ৫১৭ পৃঃ।)

আবু হুরাইরাহ (রাঃ) বলেন, ‘রাসূলুল্লাহ (সা:)-এর চেয়ে উজ্জ্বলতর কোন চেহারা আমি কক্ষনো দর্শন করিনি। তাঁর চেহারায় যেন সূর্য কিরণের ন্যায় ঝলমল করতো। আর রাসূলুল্লাহ (সা:)-এর চেয়ে দ্রুত চলন কারো দেখিনি, জমিন যেন তার কাছে সংকুচিত হয়ে যায়। আমরা খুব কষ্ট করে তার নাগাল পেতাম অথচ এটা তার কাছে কিছুই মনে হতো না।

কা‘ব বিন মালিক বর্ণনা করেন যে, ‘রাসূলুল্লাহ (সা:) যখন প্রফুল্ল থাকতেন তখন তাঁর মুখমণ্ডল এরূপ চমকিত হতো যে, মনে হতো যেন তা চন্দ্রের একটি অংশ। (সহীহুল বুখারী ১ম খন্ড ৫০২ পৃঃ।)

রাসূলুল্লাহ (সা:) যখন রাগান্বিত হতেন তখন তাঁর মুখমণ্ডল রক্তিম বর্ণ ধারণ করত। মনে হতো যেন গন্ডদ্বয়ের উপর ডালিমের রস সিঞ্চিত হয়েছে।(মিশকাত ১ম খন্ড ২২ পৃঃ, তিরমিযী কাদার অধ্যায় ২য় খন্ড ৩৫ পৃঃ।)

জাবির বিন সামুরাহ হতে বর্ণিত হয়েছে, নাবী কারীম (সা:) -এর পিন্ডলি কিছুটা পাতলা ছিল। তিনি যখন হাসতেন তখন মুচকি হাসতেন। তাঁর চক্ষুদ্বয় ছিল সুরমা বর্ণের। দেখে মনে হতো যে তিনি সুরমা ব্যবহার করেছেন। অথচ প্রকৃতপক্ষে তিনি তা ব্যবহার করেননি। (জামে তিরমিযী সারাহ সহ ৪র্থ খন্ড ৩০৬ পৃঃ।)

আনাস (রাঃ) বলেছেন, ‘রাসূলুল্লাহ (সা:)-এর হাতের তুলনায় অধিক কোমল এবং মোলায়েম রেশম কিংবা মলমল আমি স্পর্শ করি নি। অধিকন্তু, রাসূলুল্লাহ (সা:)-এর দেহ মুবারক নিঃসৃত সুগন্ধির তুলনায় অধিক সুগন্ধিযুক্ত কোন আতর কিংবা মেশক আম্বরের সুগন্ধি আমি গ্রহণ করি নি। (সহীহুল বুখারী ১ম খন্ড ৫০৩ পৃঃ, সহীহুল মুসলিম ২য় খন্ড ২৫৭ পৃঃ।)

আবূ যুহায়ফা (রাঃ) বলেছেন, ‘রাসূলে কারীম (সা:)-এর হাত মুবারক আমার মুখমণ্ডলের উপর স্থাপন করায় আমি তা বরফের ন্যায় শীতল এবং মেশক আম্বর হতে অধিক সুগন্ধিযুক্ত অনুভব করলাম। (সহীহুল মুসলিম ২য় খন্ড ২৫৬ পৃঃ।)

জাবির (রাঃ) বলেছেন, ‘রাসূলুল্লাহ (সা:) যখন কোন পথ ধরে চলতেন এবং তার পর অন্য কেউ সে পথ ধরে চললে, তাঁরা (নাবী (সা:) এর) দেহ নিঃসৃত সুগন্ধি থেকে বুঝতে পারতেন যে, নাবী কারীম (সা:) এ পথে গমন করেছেন। (দারমী, মিশকাত, ২য় খন্ড ৫১৭ পৃঃ।)

রাসূলুল্লাহ (সা:)-এর দু’ কাঁধের মধ্যবর্তী স্থানে ছিল ‘মোহর নবুওয়াত’। আকার আকৃতি ছিল কবুতরের ডিমের ন্যায় এবং তা ছিল পবিত্র গাত্রবর্ণের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ। এ মোহরের অবস্থিতি ছিল বাম কাঁধের নরম হাড়ের নিকট। এ মোহরের উপর ছিল সবুজ রেখার ন্যায় তিলের সমাহার। (সহীহুল বুখারী ২য় খন্ড ২৫৯ ও ২৬০ পৃঃ।)

আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) তোমাদের মতো দ্রুত কথা বলতেন না। তিনি এমনভাবে কথা বলতেন যে, কেউ তা (শব্দ সংখ্যা) গণনা করতে চাইলে সহজেই গণনা করতে পারত (বোখারি ও মুসলিম থেকে মিশকাতে)। 

আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) এর মুখ দিয়ে কখনো অশ্লীল কথা, অভিশাপ বাক্য ও গালির শব্দ বের হয়নি। অসন্তোষের সময় তিনি বলতেন, তার কী হয়েছে, তার চেহারা ধূলিমলিন হোক (বোখারি থেকে মিশকাতে)। 

আবদুল্লাহ ইবনুল হারিস (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর চাইতে অধিক মুচকি হাসিদাতা আর কাউকে দেখিনি (তিরমিজি থেকে মিশকাতে)।

হাফিজুল হাদীস ইমাম জালালুদ্দীন সুয়ূতী(রহঃ)বর্ণনা করেন,হযরত হাকীম তিরমীযি (রহ:)” নাওয়াদিরুল উছুল” নামক কিতাবে জাকওয়ান থেকে বর্ননা করেন,নিশ্চয়ই সূর্য ও চাঁদের আলোতেও রাসূলে পাক (সা:) উঁনার ছায়া মুবারক দেখা যেত না।”(খাছায়েছুল কুবরা,১ম খন্ড,১২২ পৃষ্ঠা)

ইমাম যুরকানী (রহ:) বলেন,“সূর্য চন্দ্রের আলোতে নবী করীম (সা:) এঁর দেহ মোবারকের ছায়া পড়তোনা।কেননা,তিঁনি ছিলেন আপদমস্তক নূর”। [যুরকানী শরীফ ৪র্থ খন্ড, পৃষ্ঠা ২২০]

ইমামুল জলীল, সাইয়্যিদুল মুফাসসীরিন, আল্লামা মাহমূদ নাসাফী (রহ:) বলেন, আমীরুল মু’মিনিন,হযরত উসমান (রা:) হুজুর পাক (সা:) উঁনাকে বলেছিলেন, নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ পাক আঁপনার ছায়া মুবারক মাটিতে পড়তে দেন নাই। যাতে মানুষ আঁপনার ঐ ছায়া মুবারকে পা রাখতে না পারে।”[তাফসীরে মাদারিকুত তানযীল-সূরা নূরের তাফসীর (তাফসীরে মাদারিক,পৃষ্ঠা-৩২১]

ইবনুল কাইয়িম (রহ.) বলেন, ‘যেহেতু সৌন্দর্য অন্তর আকৃষ্টের কারণ এবং মর্যাদা দানের কারণ হয়, এজন্য আল্লাহ তাআলা প্রত্যেক নবীকেই সুন্দর আকৃতি, সুন্দর চেহারা, শ্রেষ্ঠ বংশ, উত্তম চরিত্র ও মায়াবী কণ্ঠস্বর দিয়ে প্রেরণ করেছেন।’

আবূ কতাদাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত।তিনি বলেন,রাসূলুল্লাহ (সা:) বলেছেনঃ যে আঁমাকে স্বপ্নে দেখেছে সে সত্যই দেখেছে। (বুখারী ও মুসলিম)

হযরত আবূ হুরায়রা (রা:) বলেন: রাসূল (সা:) বলেছেনঃ যে ব্যক্তি আঁমাকে স্বপ্নযোগে দেখল,সে যেন আঁমাকে বাস্তবেই দেখল।কারণ শয়তান আঁমার আকৃতি ধারণ করতে পারে না। (সহীহ বুখারী, হা/নং-৬৫৯২)

প্রাজ্ঞ আলেমরা নবীজি (সা.)-কে স্বপ্নে দেখার বিশেষ তিনটি আমল বর্ণনা করেছেন। তাহলো—ক. অন্তরে নবীজি (সা.)-এর প্রতি পূর্ণাঙ্গ বিশ্বাস ও ভালোবাসা, খ. সুন্নতের অনুসরণ, গ. বেশি বেশি দরুদ পাঠ করা। (ফাতাওয়ায়ে ফকীহুল মিল্লাত: ২/২৩৪)

আল্লাহ্‌ সবাইকে সপ্নে রাসূলুল্লাহ (সা:) এর সাক্ষাৎ লাভের সৌভাগ্য নসীব করুক। আমিন।

x

0 Comments:

Post a Comment