Thursday, June 14, 2018

// // Leave a Comment

শেষ কান্না

 বনী ইসরাইল গোত্রে জনৈক ভবঘুরে ও লম্পট লোক ছিল। বিভিন্ন ধরণের গর্হিত কাজে সে লিপ্ত থাকতো। নগরবাসীর বহু চেষ্টাও তার কোন প্রকার সংশোধন করতে পারে নাই। অবশেষে অতিষ্ঠ হয়ে সকলেই আল্লাহর দরবারে তার কদর্যতা হতে মুক্তি পাওয়ার জন্য কায়মনোবাক্যে মুনাজাত করলো। অতঃপর, আল্লাহ্‌ তা’আলা তাদের দো’আ কবুল করে হযরত মূসা আলাইহিস সালামের নিকট ওহী পাঠালেনঃ ‘হে মূসা! বনী ইসরাইল গোত্রে একজন ভন্ড যুবক আছে,
তাকে শহর হতে বহিষ্কার করে দাও, যাতে শুধুমাত্র এক ব্যক্তির পাপের কারণে সমগ্র নগরবাসীর উপর আমার গজব নাযিল না হয়। হযরত মূসা আলাইহিস সালাম আল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী তাকে বহিষ্কার করে দিলেন। কিন্তু সেই যুবক শহর হতে বহিষ্কৃত হয়ে পার্শ্ববর্তী অপর এক বস্তিতে আশ্রয় গ্রহণ করে। আল্লাহ্‌ তা’আলা হযরত মূসা আলাইহিস সালামের নিকট পুনরায় ওহী পাঠিয়ে তাকে সেখান থেকেও বহিষ্কার করার নির্দেশ দিলেন। হযরত মূসা (আঃ) তাই করলেন। অবশেষে, লোকটি এক নির্জন প্রান্তরে গিয়ে আশ্রয় নিলো। যেখানে মানুষ বা পশুপক্ষী এমনকী তরুলতা বলতে কিছুই ছিল না। পরবর্তী এক পর্যায়ে লোকটি সেখানে মারাত্মকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ে। এহেন অসহায় অবস্থায় তার পার্শ্বে সাহায্যকারী বলতে কেউ ছিল না। এই করুণ অবস্থায় সে ভুলুন্ঠিত হয়ে মাটির উপর মাথা রেখে বারবার বলছিলঃ ‘হায়! আজকে যদি আমার মা আমার কাছে থাকতেন, তা’হলে তিনি আমার দুঃখে দুঃখিতা হতেন, আমার সেবা-শুশ্রূষা করতেন, মায়া-মহব্বত করতেন, আমার জন্য নয়ন সিক্ত করে রোদন করতেন। হায়! আজকে যদি আমার পিতা কাছে থাকতেন, তাহলে তিনি আমার সাহায্য- সহযোগিতা করতেন। হায়! যদি আমার স্ত্রী পার্শ্বে থাকতো, তা’হলে সে আমার দুঃখে ক্রন্দন করতো। হায়! যদি আমার সন্তান-সন্ততি এখানে থাকতো, তা’হলে তারা আমার মৃতদেহের পার্শ্বে বসে কান্নাকাটি করতো আর বলতো,- ‘হে আল্লাহ্‌! আমাদের প্রবাসী পিতাকে তুমি ক্ষমা করে দাও, তিনি অসহায় দুর্বল, তোমার না-ফরমান, অবাধ্য ও স্বেচ্ছাচারী; লোকেরা তাকে শহর থেকে বস্তিতে বের করে দিয়েছে, পুনরায় তাকে বস্তি থেকে বিজন প্রান্তরে বহিষ্কার করেছে; আর আজকে তিনি ইহকালের এই বিজন ভূমি থেকে পরকালের পথে চিরবিদায় গ্রহণ করছেন, সবকিছু থেকে তিনি নিরাশ ও বঞ্চিত হয়ে একমাত্র তোমার পানে রওয়ানা হচ্ছেন। আয় আল্লাহ্‌! আপনি আমাকে আমার পিতা-মাতা, সন্তান-সন্ততি ও স্ত্রী থেকে সুদূর প্রান্তরে নিক্ষেপ করেছেন, জীবনের এই করুণ মুহূর্তে দয়া করে আমাকে আপনার রহমত ও করুণা থেকে চিরবঞ্চিত করবেন না। তাদের বিচ্ছেদে আপনি আমার অন্তর দগ্ধীভূত করেছেন, মেহেরবান করে আমার পাপরাশির কারণে আমাকে দোযখের অগ্নিতে দগ্ধীভূত করবেন না। ’ 
লোকটির এই করুণ আর্তনাদ আল্লাহর দরবারে কবুল হলো। তার স্ত্রী ও মা’র আকৃতি দিয়ে দু’জন হূর, সন্তান-সন্ততির আকৃতি দিয়ে জান্নাতের কয়েকজন শিশু-কিশোর এবং পিতার আকৃতি দিয়ে একজন ফেরেশতা পাঠিয়ে দিলেন। তারা সকলেই লোকটির পার্শ্বে বসে ক্রন্দন করতে লাগলো। এভাবে সকলের উপস্থিতিতে সে আনন্দচিত্তে আল্লাহর সাথে মিলিত হয় এবং আল্লাহ্‌ পাক তার সমস্ত গুনাহ্‌ মাফ করে দেন। এভাবে সম্পূর্ণ পবিত্র হয়ে সে দুনিয়া থেকে বিদায় নেয়। 
অতঃপর, আল্লাহ্‌ তা’আলা হযরত মূসা (আঃ) –এর নিকট ওহী পাঠালেনঃ ‘হে মূসা! তুমি অমুক বিজন প্রান্তরে গিয়ে দেখ, আমার এক প্রিয় বান্দার ইন্তিকাল হয়েছে, তুমি তার কাফন-দাফনের ব্যবস্থা কর। আল্লাহর হুকুম অনুসারে হযরত মূসা আলাইহিস সালাম তথায় গিয়ে সে যুবকটিকেই দেখলেন, যাকে তিনি ইতিপূর্বে আল্লাহর হুকুমে শহর থেকে বস্তিতে আবার বস্তি থেকে বিজন ভূমিতে বিতাড়িত করেছিলেন। তিনি আরও দেখলেন যে, লোকটির আশেপাশে বেহেশতের হূর-পরীগণ তাকে বেষ্টন করে বসে আছে। এতদ্দর্শনে হযরত মূসা (আঃ) আল্লাহর নিকট আরয করলেনঃ ‘হে মহান প্রভু! এই লোকটি তো সে-ই যাকে আমি আপনার হুকুমে শহর ও বস্তি থেকে বহিষ্কার করেছি। ’ আল্লাহ্‌ তা’আলা বললেনঃ ‘হে মূসা! আমি তার প্রতি দয়া ও রহমত নাযিল করেছি এবং তার যাবতীয় পাপকার্য ক্ষমা করে দিয়েছি। কারণ, সে এই বিজন প্রান্তরে স্বীয় জন্মভূমি, পিতা-মাতা, সন্তান-সন্ততি ও পরিবার-পরিজন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে অসহায় অবস্থায় কান্নাকাটি করেছে। আমি তার মা’র দেহাবয়বে বেহেশতের হূর, তার পিতার সাদৃশ্যে বেহেশতের ফেরেশতা এবং তার স্ত্রীর আকৃতিতে অপর একজন হূর পাঠিয়ে দিয়েছি। এরা সকলেই আমার কাছে তার এই দুঃখ-যাতনায় ভরপুর মুসাফেরী অবস্থার প্রতি রহম ও করুণার জন্য প্রার্থনা করেছে। একজন আশ্রয়হীন মুসাফির যখন মারা যায়, তখন আসমান ও যমীনের সমগ্র মাখলুক তার প্রতি দয়া ও রহমত বর্ষণের জন্য (আল্লাহর কাছে) প্রার্থনা করতে থাকে; সুতরাং এ অবস্থায় আমি কি তার প্রতি দয়া ও করুণা প্রদর্শন করবো না? অথচ আমিই একমাত্র অনন্ত মেহেরবান ও অসীম দয়ালু। ’
কোন মুসাফির যখন অন্তিম সময়ে উপনীত হয়, তখন আল্লাহ্‌ তা’আলা বলেনঃ ‘ওহে আমার ফেরেশতাগণ! লোকটি স্বদেশত্যাগী মুসাফির, স্বীয় পরিবার-পরিজন,সন্তান-সন্ততি, পিতা-মাতা ও আত্মীয়-স্বজন থেকে বহুদূরে অবস্থানরত। মৃত্যুর পর তার জন্য ক্রন্দনকারী অথবা শোক বা দুঃখ প্রকাশকারী কেউ নাই। ’ একথা বলে আল্লাহ্‌ তা’আলা তার পিতা-মাতা, সন্তান-সন্ততি ও আত্মীয়-স্বজনের আকৃতি ও দেহাবয়বে কয়েকজন ফেরেশতা পাঠিয়ে দেন। তারা সেই মুসাফির ব্যক্তির শিয়রপার্শ্বে উপবেশন করলে, সে চক্ষু উম্মিলন করে তাদেরকে প্রত্যক্ষ করে এবং অপার্থিব আনন্দ উপভোগ করে। অতঃপর এই উৎফুল্ল অবস্থাতেই সে ইহজগত ত্যাগ করে। তারপর যখন এ ব্যক্তির জানাযা উঠিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়, তখন ফেরেশতাগণও তার সঙ্গে থাকেন এবং কিয়ামত পর্যন্ত সেই ব্যক্তির কবরের পার্শ্বে বসে তার মাগফেরাত ও উচ্চ মর্যাদার জন্য আল্লাহর দরবারে মুনাজাত করতে থাকেন। আল্লাহ্‌ পাক ইরশাদ করেনঃ ‘আল্লাহ্‌ তা’আলা তাঁর বান্দাদের প্রতি দয়ালু। ’ (সুরা শুরাঃ ১৯)
হযরত ইবনে আত্তার (রহঃ) বলেনঃ ‘তুমি যদি কোন বান্দার অন্তঃকরণের সত্যাসত্য ও প্রকৃত অবস্থা যাচাই করতে চাও, তা’হলে তার সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য ও দুঃখ-কষ্ট উভয় অবস্থার কার্যকলাপের প্রতি লক্ষ্য কর। যদি সে কেবল সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের সময়েই আল্লাহর শোকর আদায় করে, অথচ, দুঃখ-কষ্টের সময় হা-হুতাশ করে, তা’হলে বুঝতে হবে সে মিথ্যুক ও প্রতারক। বস্তুতঃ কোন ব্যক্তি যদি সমগ্র জ্বিন ও মানবের সাকুল্য জ্ঞানের অধিকারী হয়, অতঃপর কোন দুর্ভোগে পতিত হওয়ার পর কোনরূপ শেকায়াত বা অভিযোগ উত্থাপন করে, তা’হলে এ কথা নিশ্চিত যে, তার সমস্ত ইলম ও জ্ঞানচর্চা সম্পূর্ণ বৃথা এবং সমগ্র আমল ও ইবাদত একেবারে নিষ্ফল। হাদীসে কুদসীতে আছে, আল্লাহ্‌ পাক বলেনঃ
‘যে ব্যক্তি আমার (নির্ধারিত) তাকদীরের প্রতি অসন্তুষ্ট এবং আমার দান ও নেয়ামতে অকৃতজ্ঞ, সে যেন আমাকে ছাড়া অন্য কোন রব তালাশ করে নেয়। ’
হযরত ওয়াহ্‌ব ইবনে মুনাব্বিহ (রহঃ) বলেনঃ ‘একজন নবী দীর্ঘ পঞ্চাশ বৎসরকাল আল্লাহ্‌ তা’আলার ইবাদতে মগ্ন ছিলেন। আল্লাহ্‌ তা’আলা ওহীর মাধ্যমে জানালেন যে, ‘আমি তোমাকে ক্ষমা করে দিয়েছি। ’ নবী বললেনঃ ‘ইয়া আল্লাহ্‌! আপনি আমার কোন বিষয় ক্ষমা করলেন; আমি তো জীবনে কোন গুনাহ্‌-ই করি নাই। ’ অতঃপর, আল্লাহ্‌ তা’আলা নবীর একটি শিরাকে আদেশ করলেন। ফলে, সেই শিরাতে অসহনীয় বিষ-বেদনা আরম্ভ হয়ে গেল এবং বিষম যন্ত্রণায় সারারাত্রি ঘুমাতে পারলেন না। সকাল বেলা আল্লাহ্‌ তা’আলা ফেরেশতা পাঠালেন। ফেরেশতা বললেনঃ ‘আপনার মহান প্রভু আল্লাহ্‌ তা’আলা বলেছেন, -‘তোমার দীর্ঘ পঞ্চাশ বছরের ইবাদত আমার দেওয়া একটা সামান্য সুস্থ শিরা’র নে’আমতের সমান নয়। ’
-মুকাশাফাতুল ক্কুলুব। [খন্ড ১, পৃষ্ঠা ৩২-৩৬]
***

0 Comments:

Post a Comment